এজেন্সি/এ্যাডফার্ম জব অভিজ্ঞতা

( এটা আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা অনেকের সাথে অমিল থাকাটাই সাভাবিক )
“এজেন্সি/এ্যাডফার্মে ” কাজের অভিজ্ঞতাটা কয়েক বছরের কিন্তু জবের অভিজ্ঞতাটা প্রায় দুই বছরের।যখন আমি পেশাদার আঁকিয়ে হয়ে উঠছি তখন হাবিব স্যার, (বিশেষ করে )মেহেদী ভাই ও তন্ময় ভাই দের থেকে দেশের কাজের পরিধি,ধরন সম্পর্কে কিছুটা ধারনা পাই। তখন “এজেন্সি” জবের ব্যাপারে সতর্ক করা হতো। আবার এই দেশে কার্টুনিস্ট / আর্টিস্টদের “এজেন্সি” ছাড়া তেমন কোন প্ল্যাটফর্ম নেই বললেই চলে।

এখন কেন সিনিয়াররা “এজেন্সি” ব্যাপারে সতর্ক করেন ?! আমি আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা , ধারনা শেয়ার করছি।তাতে আমার মত আর্টিস্ট/কার্টুনিস্টদের ( নুতুন /যারা জব করেন নাই)“এজেন্সি” ব্যাপারে ধোঁয়াশা কিছুটা কাটবে আশা করি ।

যেভাবে এলাম “এজেন্সিতে”

আমার “এজেন্সি” জবের তেমন ইচ্ছা ছিলো না।পার-টাইম জব ও নিজের ক্লায়েন্ট,এজেন্সি,পত্রিকায় ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করতাম।সুখে শান্তিতেই থাকার কথা ছিল কিন্তু এখান থেকে যে অভিজ্ঞতাটা হলো, তা হচ্ছে কাজ পাওয়া সহজ টাকা পাওয়া সহজ না।মাসের পর মাস বিল আটকে থাকে,ডেট দিয়ে ঘুরায়, দিলেও সামান্য, খুব ইন্সিকিউর ফিল করি, আর কাজ করতে পারি না। এমন কোন প্ল্যাটফর্ম নাই যেখানে সময়মত ন্যায্য বিল তুলতে হেল্প করবে।

তাছাড়া মধ্যবিত্ত পরিবার ফ্রিল্যান্সার এ একদম ভরসা করতে পারে না ।ফ্রিল্যান্সার থেকে অনেক কম আয়ের চাকুরিতেই তারা সন্তুষ্ট।ব্যাস জবে জয়েন করলাম ।

“এজেন্সিতে” অভিজ্ঞতা

আমাকে মূলত এয়ারটেল এর কার্টুন করার জন্য নেয়া হয়েছিল। ( পরে অবশ্য প্রায় ৪০ টা ব্রান্ডের কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে,যেটা সবার হয় না। এটা আমার সৌভাগ্য বলা যেতে পারে )

অফিসে প্রথম মিটিং – বিশাল বোর্ডরুম, আমারা ৭/৮ জন , খুবই ফরমাল এবং প্রচণ্ড সিরিয়াস।প্রথমেই সোহেল ভাই আমাকে বলল “ শোন আজ এয়ারটেলের কিছু আইডিয়ার জন্য মিটিং ডেকেছি,প্রথমে তুমিই বলো তোমরা উন্মাদে কিভাবে আইডিয়া বের কর ?” (এই ভাইকে Advertising এ পারফেক্ট / আইডল মনে হয়)

আমি বললাম, ভাই , সত্যি বলতে আইডিয়ার জন্য মিটিং করতে হয় আমি জানতাম না। হাবিব স্যা্র তো শুধু আমাদের সাথে আড্ডা দেয়।এখান থেকেই কিভাবে যেন আইডিয়া পাই ।(এভাবেই উন্মাদে হয়ে আসছে গত ৩৬ বছর ধরে) তারপর আর বেশিদিন আমি এ রকম মিটিং এ থাকতে পারি নাই।

যাইহোক দেখলাম, অফিস থেকে বের হওয়ার টাইম বলে কিছু নেই, সবাই খুব ট্যেকনিকেল, প্রায় সবার মধ্যে চলে ব্লেমিং গেম, কাজের থেকে তেলের মূল্যায়ন বেশী,সময়ের তুলনায় কাজ অনেক বেশি,ভালো করার ইচ্ছার চেয়ে শেষ করার তাগাদা বেশী , তারপরে আবার ক্লায়েন্টের ফিডব্যাক। এসব মিলে দিন শেষে আমরা একেকজন প্রোডাকশন ম্যান / লেবার ছাড়া কিছু না 😀 । তারপরেও এটাই একটা আলাদা সংসার যেখানে জীবন কত খুঁটি নাটি ঘটনার সাক্ষি ।

আমি অনেক দিন ভেবেছি এই জব / জীবন কে কি ধরনের জব /জীবন বলা যেতে পারে ?! সাদিব ভাই খুব সুন্দর একটা উত্তর বলেছে,সেটা হোল “This is not a job, this is life style”

( মহামান্য ক্লায়েন্ট) “পৃথিবীর সবচে অধৈর্য ও অস্থির প্রানি

এইখানে আমার মনেহয় সিস্টেমের সবচে বড় গোলমাল।

ক্লায়েন্ট নিঃসন্দেহ আমাদের থেকে ব্যাবসা ভালো বোঝে……নন্দনতত্ত্ব না। যখন সারাদিন হাস্যকর সব ফিডব্যাক দিয়ে সন্ধেবেলা সকালের টাই এপ্প্রুপ করে তখন মনে হয় ফিডব্যাকের কঠিন প্রতিজ্ঞাটা পুরন করলো।ফিডব্যাকের ভিড়ে অনেক কাজই শেষ পর্যন্ত আর আমাদের থাকে না, ক্লায়েন্ট আমাদের অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে ব্যবহার করে মাত্র ।আমরা আর্ট ,নন্দন ত্বত্ত নিয়ে ঘাটাঘাটি না করে ক্লায়েন্টের মন নিয়ে ঘাটাঘাটি করলে হয়তো ভালো করতাম। আমার মনে হয় ক্লায়েন্ট রুচির ব্যাপারে আরও সচেতন হওয়া দরকার, জিনি এ কাজে দায়িত্তে থাকেন তিনি শিল্পবোদ্ধা না হলেও কমছে কম শিল্পসাহিত্যের সাথে জরিত থাকাটা জরুরী, তা না হলে ডাঃ এর অপারেশন নন ডাঃ গাইড করার মতো হয়ে যায় ।

সত্যজিৎ রায় একসময় এড ফার্মে কাজ করার চেষ্টা করে “ব্যার্থ !” হয়ে বলেছিলেন, “এখানে কাজ করা অসম্ভব, কারন এখানে ক্লায়েন্ট নামে একটা বস্তু আছে “

আসলে ক্রিয়েটিভ ওয়ার্ক তো আর আলু পটল না, যে বেচে দিলাম আর শেষ হয়ে গেল।

এটারও একটা দ্বায়বদ্ধতা আছে।এটা অনেক চোখ দেখবে, এটা আমাদের  নান্দনিকতা ও  রুচির পরিচয় বহন করবে, যার প্রভাব সমাজে খুব সামান্য হলেও পরবে।

রুচির দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার দায়ভার আমরা এড়াতে পারব না।

“এজেন্সি/এ্যাডফার্মে ” জবের কিছু ভালো আর খারাপ দিকের কথা সংক্ষেপে উল্লেখ করা যেতে পারে ঃ

খারাপ দিকটা হলোঃ

  1. চিন্তা করার ক্ষমতা বিশেষ ভাবে কমে যাওয়া ।
  2. নিজেস্ব স্বকীয়তা হারানো, ক্লায়েন্ট নির্ভর যেখানে নিজের স্বাধীনতা কম।
  3. ফিডব্যাকের কারনে নিজের আত্ববিশ্বাসে ঘাটতি পরা ।
  4. আর্টিস্ট/ ওয়ার্ক সার্কেল এর সাথে দূরত্ব বেরে যাওয়া।
  5. ক্রিয়েটিভিটি লোপ পাওয়া ।
  6. ভালো লাগুক আর না লাগুক কাজ করতেই হয়, ইচ্ছামত ছুটি নেয়া অসম্ভব
  7. অর্থনৈতিক ভাবে ডিপেন্ডেড হয়ে যাওয়া।
  8. অনেক কিছু করার ইচ্ছা কিন্তু সময়ের অভাবে করতে না পারা ।

ভালো দিকটা হলোঃ

  1. কাজের চাপ নেয়ার ক্ষমতা আর দক্ষতা বাড়ানো ।
  2. অনেক ব্যান্ডের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা ।
  3. টিম ওয়ার্ক করা ।
  4. আর সবচেয়ে বড় যেটা সেটা হচ্ছে দৈন্দিন রুটিনে চলা/ডিসিপ্লিনড হওয়া।

পরিশেষে আমার যেটা মনে হয়েছেঃ

আমাদের দেশে আর্টিস্টদের/কার্টুনিস্টদের কমন কিছু প্রতিভা থাকে ( সবার না )

যেমনঃ

  • বিশৃঙ্খল জীবন যাপন
  • অলসতা
  • কমিটমেনের অভাব
  • সময়জ্ঞান হীনতা
  • খামখেয়ালি
  • কাজের অহঙ্কার

আরও কিছু

আর এসব ক্ষেত্রে জব একটা সহজ সমাধান হতে পারে সাথে একটা প্লাটফরম হিসাবে ব্যাবহার করা যেতে পারে।

রাজীব
আগস্ট ২০১৭
বসুন্ধারা আবাসিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Top